গত কয়েক বছর আগেও এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পরপর মিষ্টি বিতরণের ধুম পড়ে যেতো পাড়া-মহল্লা এবং আত্মীয়-স্বজনের মাঝে। শুধু তাই নয়, এলাকায় এলাকায় মিষ্টি বিতরণের পাশাপাশি স্কুলশিক্ষকদের বাসায় পাঠানো হতো মিষ্টি। এই ফলাফল প্রকাশকে কেন্দ্র করে জমজমাট বেচা-বিক্রি হতো মিষ্টির দোকানে। দোকানিরাও অনেকটাই আশায় থাকতেন কবে এসএসসির ফলাফল প্রকাশ হবে। তবে গত তিন-চার বছর ধরে সে চিত্র দেখা যাচ্ছে না ছোট-বড় সব মিষ্টির দোকানে। কোনো ভিড় নেই, অলস সময় কাটাতে দেখা যাচ্ছে দোকানের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের।
গতকাল রোববার এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলপ্রকাশের পর রাজধানী বিভিন্ন এলাকায় বিক্রমপুর, রস, ভাগ্যকূল, মধুমিতা, বস, মীনা, সালাম ডেইরি ও মুসলিম সুইটসের দোকান ঘুরে এমনই চিত্র দেখা গেছে। দোকানগুলোতে চলছে প্রতিদিনের মতোই বেচা-বিক্রি। এর আগে যেকোনো পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পরপরই ক্রেতার ভিড় লেগে যেতো মিষ্টির দোকানে। সকাল ১১টার পরপরই চলতো টানা বেচা-বিক্রি। এসময়ে দোকানে অতিরিক্তি কর্মচারী রাখা হতো মিষ্টি বিক্রির জন্য। তবে এবার মোটেই বেচা-বিক্রি নেই দোকানগুলোতে।
সরজমিনে দেখা গেছে, রাজধানীর ধানমন্ডি, কলাবাগান, সায়েন্সল্যাব, নিউমার্কেট, আজিমপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্রমপুর, রস, ভাগ্যকূল, মিঠাই, মীনা সুইটস, মধুমিতা, বস, মুসলিম সুইটসসহ ছোট-বড় মিষ্টির দোকান তেমন ক্রেতা নেই। একইচিত্র রাজধানীর ডেমরা-যাত্রাবাড়ি, শ্যামপুর-শান্তিনগর, কাকরাইল, মুগদ্ধা-সবুজবাগ, খিলগাঁও-বেইলি রোড, পল্টন এলাকায় বেলা সাড়ে ৩টা পর্যন্ত অনেক দোকানিকে গল্প করে সময় পার করতে দেখা যায়। একটি মিষ্টির দোকানে এসেছেন একজন অভিভাবক। এসএসসির ফলপ্রকাশের চার ঘণ্টার মাথায় একজন অভিভাবকে দেখা যায় মিষ্টির দোকান থেকে মিষ্টি কিনতে। তার মতে, এখন আর মিষ্টি খাওয়ানোর প্রচলন নেই। এর পরিবর্তে ফল-মূল বা ভারি খাবার খাওয়ানো হয় মেহমানদের। সালেহা নামের এ অভিভাবক মুসলিম সুইটসে এসেছেন মিষ্টি কিনতে। তার মেয়ে এবার রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়েছে। তিনি বলেন, এক সময় মিষ্টির প্রচলন ছিলো, তবে নানা রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ায় মিষ্টির পরিবর্তে এখন ফলেই ভরসা সবার। এখন নিকটজনরা মিষ্টি খেতে চান না, তারপরও একটু মিষ্টি কিনেছি। তবে মেহমানদের মিষ্টির পরিবর্তে ফল বা অন্য ভারি খাবার খাওয়ানোর ইচ্ছে আছে। তবে ভাগ্যকূল সুইটসের শান্তিনগর ব্র্যাঞ্চ ম্যানেজার সুজন ঘোষ বলেন, এর আগে যে কোনো পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা মানেই মিষ্টি খাওয়ানোর ধুম পড়তো। আমাদের দোকানগুলোতেও চলতো ভালো বিক্রি। মিষ্টি বিক্রির জন্য এসময়ে অতিরিক্ত কর্মচারী ভাড়া করা লাগতো। মুসলিম সুইটসের সেলসম্যান জাকির হোসেন বলেন, এসএসসি বা এইচএসসির রেজাল্টের পর বেচা-বিক্রির ধূম পড়ে যেতো। তবে গত দুই বছর ধরে এ দু’টি পরীক্ষায় মোটেও বেচা-কেনা থাকে না। গত এসএসসি পরীক্ষায়ও কোনো বেচা-কেনা হয়নি। যা হয়েছে সপ্তাহের অন্য দিনের মতো। আজ এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পরও একই অবস্থা, কোনো বিক্রি নেই। কলাবাগানের বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভান্ডারের প্রধান শাখায় কর্মচারিরা অলস সময় পার করছেন বিক্রয়কর্মীরা। দোকানের ব্যবস্থাপক জানান, আগে যেকোনো পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পরপরই দোকানে ক্রেতাদের ভিড় লেগে যেত। অভিভাবকরাই ভিড় জমাতেন। সকাল ১১টার পর থেকে একেবারে রাত অবধি চলত টানা বেচা-বিক্রি। শুধু ফল প্রকাশের দিনই নয় বরং এর পরের দুইদিনও চলত বেশ বেচাকেনা। তবে এবার ফল প্রকাশের দিনেও বেচা-বিক্রি নেই।
রাজধানীর বাড্ডা এলাকার কয়েকটি মিষ্টির দোকান ঘুরে দেখা যায়, থরে থরে বাহারি আইটেমের মিষ্টি সাজানো থাকলেও খুব একটা ক্রেতা নেই। স্বাভাবিক দিনের মতোই দু-একজন করে আসছে-যাচ্ছে। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেও চোখে পড়েনি কোনো এসএসসি ফল পাওয়া কোনো শিক্ষার্থী বা অভিভাবককে। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মিষ্টির দোকানের এক বিক্রেতা বলেন, রেজাল্টের দিনে একটা সময় শিক্ষার্থীর অভিভাবকরা হাসিমুখে এসে কেজি কেজি মিষ্টি নিয়ে যেত। আমরাও আগে থেকেই সেভাবে প্রস্তুতি নিয়ে বেশি করে মিষ্টি বানাতাম। এখন আর তেমন নেই। রেজাল্টকে ঘিরে যে উৎসবের আমেজ তৈরি হতো সেটি মনে হয় হারিয়ে গেছে। একইকথা জানিয়েছেন পাশের দোকানদার বারেক মিয়া। তিনি বলেন, আপনারাই তো দেখতেছেন কি অবস্থা। অন্যান্য দিনের মতোই মিষ্টি বিক্রি স্বাভাবিক রয়েছে। কয়েকবছর আগেও রেজাল্ট ভালো হলে মিষ্টিমুখ করানোর জন্য যে উৎসবের আমেজ তৈরি হতো সেটি নাই। দুই তিন বছর ধরেই এই অবস্থা। এই এলাকায় অনেক নামী-দামী ব্র্যান্ডের মিষ্টির দোকানের আউটলেট রয়েছে। প্রায় সবগুলোতেই একই অবস্থা দেখা যায়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর প্রায় অধিকাংশ এলাকাতেই একই অবস্থা।
এদিকে কয়েক বছরে মিষ্টির বা মিষ্টান্ন আইটেমের দাম বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। সাড়ে তিনশ টাকার নিচে কোনো মিষ্টি নেই বললেই চলে। এছাড়াও রসগোল্লা, স্পঞ্জ, ছানার মিষ্টি চমচম কিনতে গুণতে হবে সাড়ে চারশ টাকার উপরে। রসমালাই বা একটু বাহারি আইটেমের মিষ্টি কিনতে গুনতে হবে পাঁচশ টাকার উপরে। যা ২-৩ বছর আগেও প্রায় অর্ধেক দামে বিক্রি হতে দেখা গেছে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Dainik Janata

এসএসসির ফলপ্রকাশেও ভিড় নেই মিষ্টির দোকানে
- আপলোড সময় : ১৩-০৫-২০২৪ ১২:২৪:২৭ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ১৩-০৫-২০২৪ ১২:২৪:২৭ পূর্বাহ্ন


কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ